মুর্শিদাবাদ ট্রেন দুর্ঘটনা: গেটম্যান মদ্যপ ছিলেন না, জানাল রেল — স্টেশন মাস্টারের ভূমিকাও কি তদন্তে?

 

মুর্শিদাবাদের খাগড়াঘাট ও কর্ণসুবর্ণ স্টেশনের মাঝের গোবিন্দপুর লেভেল ক্রসিংয়ে শুক্রবার ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর প্রথমে গেটম্যানের গাফিলতির অভিযোগ সামনে এলেও তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গেটম্যান অনুপ কর্মকারকে মদ্যপ অবস্থায় কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার পূর্ব রেল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পরীক্ষায় অনুপ কর্মকারের শরীরে মদের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানান, ডিউটির সময় গেটম্যান মদ্যপ ছিলেন না বলেই পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। একইসঙ্গে পূর্ব রেলের অধীন সমস্ত নন-ইন্টারলক লেভেল ক্রসিংয়ের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে সাত দিনের বিশেষ পরিদর্শন অভিযানও শুরু হয়েছে। আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে সেই রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শনিবার ধৃত গেটম্যানকে আদালতে তোলা সম্ভব হয়নি। তাঁকে প্রথমে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে পরে তাঁকে আজিমগঞ্জ রেলপুলিশ থানায় ফিরিয়ে আনা হয়। রবিবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হতে পারে।

হাসপাতালের বেড থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অনুপ কর্মকার। তাঁর দাবি, প্রতিদিনের মতো ট্রেন চলাচলের তথ্য স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকেই পান তিনি। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন ডাউন ট্রেন ছাড়ার বিষয়ে তাঁকে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি। অনুপের কথায়, ট্রেনটি পিছন দিক থেকে আসায় তিনি সেটি দেখতে পাননি। তাঁর আরও দাবি, খাগড়াঘাট স্টেশন থেকে নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ছাড়ার পর গেট বন্ধ করার জন্য অন্তত দশ মিনিট সময় থাকবে বলে তিনি ভেবেছিলেন। সেই কারণেই গেট খোলা ছিল। যদিও গেটম্যানের এই দাবির বিষয়ে এখনও পর্যন্ত স্টেশন মাস্টার বা রেল কর্তৃপক্ষের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

অন্যদিকে দুর্ঘটনায় আহত তিন খুদে পড়ুয়া—আনিশা খাতুন, বিশ্বেশ্বর মণ্ডল ও শামিমা খাতুন—বর্তমানে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনজনের অবস্থাই এখন স্থিতিশীল। চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে আনিশাও, যার শুক্রবার রাত পর্যন্ত অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। তার হাতে অস্ত্রোপচার করা হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। আহত পুলকার চালক সাহেব শেখেরও একটি অস্ত্রোপচার ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও একটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

শনিবার ঘটনাস্থলে পৌঁছে রেলসুরক্ষা বাহিনীর আধিকারিকরা সরেজমিনে তদন্ত করেন। দুর্ঘটনার অভিঘাতে রেললাইনের কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালীন স্থানীয় বাসিন্দারাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, রেলগেটের পূর্বদিকে দীর্ঘ অংশ জুড়ে কোনও পাঁচিল বা নিরাপত্তা বেড়া নেই। ফলে শিশুদের রেললাইনে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে ওই খোলা অংশে দ্রুত নিরাপত্তা বেড়া বা পাঁচিল নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।


এখন প্রশ্ন একটাই—যদি গেটম্যান ডিউটির সময় মদ্যপ না-ই হয়ে থাকেন, তবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার নেপথ্যে ঠিক কোথায় ছিল গাফিলতি? শুধুই কি গেটম্যানের ভুল, নাকি স্টেশন মাস্টারের ভূমিকা-সহ গোটা সিগন্যালিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকেও তদন্তের নজর ঘুরছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলবে রেলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পরই।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال